মাসিক অনিয়মিত হওয়ার কারণ কী?

Rate this post

মাসিক নারী শরীরের একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। সাধারণত ২১ থেকে ৩৫ দিনের মধ্যে মাসিক হয়ে থাকে। তবে অনেক নারীরই মাসিক অনিয়মিত হয়—কখনও আগে, কখনও পরে, আবার কখনও একেবারেই হয় না। এটি নিয়ে চিন্তা বা লজ্জা না পাওয়ার কিছু নেই। বরং কারণ বুঝলে চিকিৎসা সম্ভব। এই লেখায় আমরা জানব মাসিক অনিয়মিত হওয়ার পেছনে কী কী কারণ থাকতে পারে এবং কখন ডাক্তার দেখানো জরুরি।

মাসিক চক্র কীভাবে কাজ করে? (স্বাভাবিক যা বলা হয়)

মাসিক চক্র বলতে প্রথম দিনের রক্তপাত থেকে পরবর্তী মাসিক শুরুর আগের দিন পর্যন্ত সময়কে বোঝায়। একটি স্বাভাবিক চক্র ২১ থেকে ৩৫ দিনের মধ্যে হয়। তবে প্রতিটি নারীর শরীর আলাদা, তাই মাঝে মাঝে ১-২ দিনের তারতম্য স্বাভাবিক। কিন্তু যদি চক্রের দৈর্ঘ্য বারবার বদলায়, মাসিক মিস হয়, বা অনিয়মিত রক্তপাত হয়, তবে সেটিকে অনিয়মিত মাসিক বলা হয়।

অনিয়মিত মাসিক মানেই যে কোনো রোগ তা নয়। কিশোরী বয়সে প্রথম কয়েক বছর, মেনোপজের আগের সময়, বা গর্ভধারণ ও স্তন্যদানের পর মাসিক অনিয়মিত হতে পারে। তবে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম থাকলে কারণ খুঁজে বের করা জরুরি।

হরমোনজনিত কারণ: PCOS, থাইরয়েড ও প্রোল্যাকটিন

মাসিক নিয়ন্ত্রণে প্রধান ভূমিকা রাখে ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরন হরমোন। এদের ভারসাম্য নষ্ট হলে মাসিক অনিয়মিত হয়। বাংলাদেশে সবচেয়ে সাধারণ কারণ হলো পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (PCOS)। এতে ডিম্বাশয়ে ছোট ছোট সিস্ট হয়, হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং মাসিক অনিয়মিত বা বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

থাইরয়েড গ্রন্থির সমস্যা (হাইপোথাইরয়েডিজম বা হাইপারথাইরয়েডিজম) মাসিক চক্রকে প্রভাবিত করে। এছাড়া প্রোল্যাকটিন হরমোন বেশি হলে (হাইপারপ্রোল্যাকটিনেমিয়া) মাসিক বন্ধ বা অনিয়মিত হতে পারে। এই সমস্যাগুলো নির্ণয়ের জন্য রক্ত পরীক্ষা প্রয়োজন।

আপনার যদি PCOS বা থাইরয়েডের সমস্যা থাকে, তাহলে কুমিল্লায় ভেরিফাইড হরমোন ডাক্তার দেখাতে পারেন। হরমোন বিশেষজ্ঞরা সঠিক চিকিৎসা দিতে পারেন।

জীবনযাত্রার পরিবর্তন ও মানসিক চাপের প্রভাব

আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা মাসিকের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। মানসিক চাপ (পরীক্ষা, চাকরি, পারিবারিক সমস্যা) হাইপোথ্যালামাসকে প্রভাবিত করে, যা মাসিক নিয়ন্ত্রণকারী হরমোন নিঃসরণে ব্যাঘাত ঘটায়।

ওজনের আকস্মিক পরিবর্তন—হঠাৎ অনেক ওজন বেড়ে যাওয়া বা কমে যাওয়া—হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করে। অতিরিক্ত ব্যায়াম বা খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনও মাসিক অনিয়মিত করতে পারে। ঘুম কম হওয়া, অনিয়মিত খাওয়ার অভ্যাসও এর মধ্যে পড়ে।

জীবনযাত্রার কারণে মাসিক অনিয়মিত হলে সাধারণত চাপ কমানো, ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং পর্যাপ্ত ঘুম নিলে মাসিক স্বাভাবিক হতে পারে। তবে দীর্ঘদিন সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।

ঔষধ ও গর্ভনিরোধক পদ্ধতির প্রভাব

কিছু ঔষধ মাসিক চক্রকে প্রভাবিত করতে পারে। হরমোনাল গর্ভনিরোধক (বড়ি, ইমপ্ল্যান্ট, ইনজেকশন) ব্যবহারের প্রথম কয়েক মাসে মাসিক অনিয়মিত হতে পারে। জরুরি গর্ভনিরোধক পিল (ইমার্জেন্সি পিল) খাওয়ার পর মাসিক আগে বা পরে হতে পারে।

এছাড়া কিছু মানসিক রোগের ঔষধ (যেমন এন্টিডিপ্রেসেন্ট, এন্টিসাইকোটিক) প্রোল্যাকটিন হরমোন বাড়িয়ে মাসিক অনিয়মিত করতে পারে। নিজে থেকে কোনো ঔষধ বন্ধ করবেন না। চিকিৎসকের পরামর্শেই ঔষধ পরিবর্তন বা বন্ধ করা উচিত।

বাজারে ‘মাসিক নিয়মিত করার ট্যাবলেট’ নামে অনিয়ন্ত্রিত ঔষধ পাওয়া যায়, যা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। এগুলো এড়িয়ে চলুন।

জরায়ু ও ডিম্বাশয়ের অন্যান্য সমস্যা

জরায়ু বা ডিম্বাশয়ের কিছু শারীরিক সমস্যার কারণেও মাসিক অনিয়মিত হতে পারে। যেমন:

  • জরায়ুর ফাইব্রয়েড (মায়োমা) – অতিরিক্ত রক্তপাত ও পিরিয়ডের দৈর্ঘ্য বাড়াতে পারে।
  • এন্ডোমেট্রিওসিস – জরায়ুর আস্তরণ জরায়ুর বাইরে বেড়ে গেলে তীব্র ব্যথা ও অনিয়মিত রক্তপাত হয়।
  • পলিপ – জরায়ু বা সার্ভিক্সে পলিপ থাকলে মাসিকের মাঝে রক্তপাত হতে পারে।
  • পেলভিক ইনফেকশন (PID) – সংক্রমণের কারণে মাসিক চক্রে পরিবর্তন আসতে পারে।

এসব সমস্যা শনাক্ত করতে আল্ট্রাসাউন্ড বা অন্যান্য পরীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে। চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

কখন ডাক্তার দেখানো জরুরি?

নিচের উপসর্গগুলো থাকলে দ্রুত একজন গাইনোকোলজিস্টের পরামর্শ নিন:

উপসর্গ বিবরণ করণীয়
মাসিক ৩ মাসের বেশি মিস গর্ভধারণ ছাড়া দীর্ঘদিন মাসিক না হওয়া হরমোন পরীক্ষা ও আল্ট্রাসাউন্ড করান
অতিরিক্ত রক্তপাত প্রতি ১-২ ঘণ্টায় প্যাড বদলাতে হয়, বা ৭ দিনের বেশি রক্তপাত রক্তস্বল্পতা পরীক্ষা ও চিকিৎসা প্রয়োজন
তীব্র পেটব্যথা সাধারণ ব্যথার চেয়ে বেশি, ব্যথানাশকে না কমে এন্ডোমেট্রিওসিস বা ফাইব্রয়েডের সম্ভাবনা
মেনোপজের পর রক্তপাত মেনোপজের ১ বছর পর রক্তপাত জরুরি পরীক্ষা প্রয়োজন
জ্বর ও দুর্গন্ধযুক্ত স্রাব পেলভিক ইনফেকশনের লক্ষণ অ্যান্টিবায়োটিক চিকিৎসা প্রয়োজন

আপনার এলাকায় একজন কুমিল্লায় মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার খুঁজুন বা সরাসরি গাইনোকোলজিস্টের কাছে যান। মনে রাখবেন, অনিয়মিত মাসিক বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই চিকিৎসায় ঠিক করা যায়। তাই লজ্জা বা দ্বিধা না করে ডাক্তার দেখান।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

মাসিক কতদিন দেরি হলে প্রেগন্যান্সি পরীক্ষা করা উচিত?

যাদের মাসিক সাধারণত নিয়মিত, তাদের মাসিক ৭ দিনের বেশি দেরি করলে প্রেগন্যান্সি পরীক্ষার কথা ভাবা যেতে পারে। তবে মাসিক নির্ধারিত তারিখের ২-৩ সপ্তাহ দেরি হলে পরীক্ষা করলে ফলাফল নির্ভরযোগ্য হয়। অনিয়মিত মাসিকের ক্ষেত্রে সহবাসের ২-৩ সপ্তাহ পর প্রেগন্যান্সি টেস্ট করা নিরাপদ। মনে রাখবেন, শুধু দেরির ভিত্তিতে নিজে থেকে সিদ্ধান্ত না নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই ভালো।

অনিয়মিত মাসিক কি গর্ভধারণ বা বন্ধ্যাত্বের সমস্যা তৈরি করে?

অনিয়মিত মাসিক মানেই বন্ধ্যাত্ব নয়, তবে মাসিক অনিয়মিত হলে অনেক সময় ডিম্বাণু নির্গত (ovulation) নিয়মিত হয় না, ফলে গর্ভধারণে সমস্যা হতে পারে। বিশেষ করে PCOS, থাইরয়েড বা প্রোল্যাকটিনের মাত্রা বেশি থাকলে এ সমস্যা দেখা দিতে পারে। যারা গর্ভধারণের পরিকল্পনা করছেন, তাদের অনিয়মিত মাসিক নিয়ে দেরি না করে গাইনোকোলজিস্টের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। সঠিক চিকিৎসা ও জীবনযাত্রার পরিবর্তনের মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রেই গর্ভধারণ সম্ভব।

মাসিক নিয়মিত করার জন্য ঘরোয়া বা নিজে করার কোনো উপায় আছে কি?

কিছু অভ্যাস মাসিক চক্রে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে—যেমন পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত ব্যায়াম, মানসিক চাপ কমানো, এবং সুষম খাবার খাওয়া (শাকসবজি, প্রোটিন ও পর্যাপ্ত পানি)। তবে মনে রাখবেন, অনিয়মিত মাসিককে ‘ঘরোয়া উপায়ে’ নিয়মিত করার কোনো বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত পদ্ধতি নেই। খাওয়ার কিছু জিনিস বা ভেষজ মাসিক ফেরাতে পারে বলে প্রচলিত বিশ্বাস থাকলেও সেগুলো ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। দুই-তিন মাসের বেশি অনিয়মিত থাকলে বা অন্য কোনো উপসর্গ থাকলে ডাক্তার দেখানোই সবচেয়ে নিরাপদ ও সঠিক সিদ্ধান্ত।

এলাকার ডাক্তার খুঁজুন

তথ্যসূত্র

উপরের তথ্যসূত্রগুলো আন্তর্জাতিক জার্নাল, সরকারি স্বাস্থ্য সংস্থা বা স্বীকৃত চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া: