জন্ডিসের লক্ষণ কী?

Rate this post

জন্ডিস কোনো আলাদা রোগ নয়, বরং এটি একটি শারীরিক অবস্থা, যা রক্তে বিলিরুবিন (বিলিরুবিন) নামক একটি হলুদ রঙের পদার্থের মাত্রা বেড়ে গেলে দেখা দেয়। এই অবস্থায় ত্বক, চোখের সাদা অংশ ও মিউকাস মেমব্রেন হলুদ বর্ণ ধারণ করে। বাংলাদেশে জন্ডিসের অনেক কারণই সাধারণ — যেমন ভাইরাল হেপাটাইটিস (এ, বি, সি), পিত্তথলির পাথর, বা নবজাতকের স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় জন্ডিস। লক্ষণগুলো সঠিকভাবে চিনতে পারলে অন্তর্নিহিত কারণ দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নেওয়া যায়। এই নিবন্ধে আমরা জন্ডিসের মূল লক্ষণগুলো সহজ ভাষায় বুঝিয়ে বলব, যাতে আপনি নিজে বা পরিবারের কারও মধ্যে লক্ষণ দেখে দ্রুত সঠিক ব্যবস্থা নিতে পারেন।

জন্ডিসের প্রধান লক্ষণ: ত্বক ও চোখের পরিবর্তন

জন্ডিসের সবচেয়ে স্পষ্ট লক্ষণ হলো ত্বক ও চোখের সাদা অংশ (স্ক্লেরা) হলুদ হয়ে যাওয়া। প্রথমে চোখের সাদা অংশে হলুদাভাব ধরা পড়ে; পরে ত্বকও হলুদ হতে থাকে। হালকা জন্ডিসে শুধু চোখের সাদা অংশ হলুদ দেখায়, আর ত্বকের রং স্বাভাবিক থাকে। কিন্তু বিলিরুবিনের মাত্রা বাড়লে পুরো শরীরের ত্বক ক্রমশ কমলা-হলুদ বর্ণ ধারণ করে। ত্বকের এই রং পরিবর্তন সাধারণত মুখ থেকে শুরু হয়ে শরীরের নিচের দিকে ছড়িয়ে পড়ে। আলোতে ভালোভাবে পরীক্ষা করলে এটি সহজেই বোঝা যায়।

লক্ষণটি বুঝতে চাপ দিয়ে ত্বকে চাপ দিলে যে সাদা দাগ পড়ে, তা সাধারণত কিছুক্ষণ পর স্বাভাবিক রঙে ফিরে আসে, কিন্তু জন্ডিসে সেই দাগ হলুদ থাকে। এছাড়া জিহ্বা, তালু, এমনকি নখের নিচের অংশও হলুদ হতে পারে। মনে রাখবেন, খুব গাঢ় ত্বকের অধিকারীদের ক্ষেত্রে ত্বকের রং পরিবর্তন সহজে বোঝা নাও যেতে পারে, কিন্তু চোখের সাদা অংশের দিকে তাকালে নিশ্চিত হওয়া যায়। জন্ডিসের কারণ যদি লিভারের সমস্যা হয়, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ ও পরীক্ষা (যেমন লিভার ফাংশন টেস্ট ও বিলিরুবিন পরীক্ষা) জরুরি। এ জন্য কুমিল্লায় সেরা লিভার বিশেষজ্ঞ ডাক্তার খুঁজে নিতে পারেন।

প্রস্রাব ও মলের রঙের পরিবর্তন কেন গুরুত্বপূর্ণ?

জন্ডিসের আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হলো প্রস্রাব ও মলের রঙের অস্বাভাবিক পরিবর্তন। সাধারণত জন্ডিস আক্রান্ত ব্যক্তির প্রস্রাবের রং গাঢ় বাদামি বা চা-এর মতো হয়, কখনো কোকাকোলার রঙেরও হতে পারে। এর কারণ হলো রক্তে দ্রবীভূত বিলিরুবিন কিডনির মাধ্যমে প্রস্রাবে নির্গত হয়ে প্রস্রাবকে গাঢ় করে তোলে। অন্যদিকে, মলের রং ফ্যাকাশে বা সাদাটে (মাটির রঙের) হয়ে যেতে পারে। সাধারণত মলের হলুদ-বাদামি রং আসে পিত্তরস থেকে, যাতে বিলিরুবিন থাকে। যদি পিত্তনালীতে কোনো বাধা থাকে (যেমন পিত্তথলির পাথর), তাহলে বিলিরুবিন অন্ত্রে পৌঁছাতে পারে না, ফলে মল ফ্যাকাশে দেখায়।

প্রস্রাব ও মলের এই পরিবর্তন জন্ডিসের ধরন বুঝতে সাহায্য করে। উদাহরণস্বরূপ, হেপাটাইটিস বা লিভারের প্রদাহে প্রস্রাব গাঢ় হয় কিন্তু মল স্বাভাবিক থাকতে পারে; আবার পিত্তনালীর বাধাজনিত জন্ডিসে মল ফ্যাকাশে হয়। তাই পরিবারের কারও মধ্যে এই লক্ষণ দেখলে দ্রুত একজন কুমিল্লায় জনপ্রিয় গ্যাস্ট্রো বিশেষজ্ঞ ডাক্তার-এর পরামর্শ নেওয়া উচিত।

জন্ডিসের সাথে দেখা দেওয়া অন্যান্য উপসর্গ

শুধু ত্বক ও চোখ হলুদ হওয়া ছাড়াও জন্ডিসের সাথে আরও কিছু শারীরিক উপসর্গ দেখা দিতে পারে, যা অন্তর্নিহিত কারণ সম্পর্কে ইঙ্গিত দেয়। সাধারণ লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে:

  • ত্বকে চুলকানি: ত্বকে জমে থাকা বিলিরুবিন চুলকানির সৃষ্টি করতে পারে। এটি বিশেষ করে পিত্তনালীর বাধাজনিত জন্ডিসে বেশি দেখা যায়।
  • অতিরিক্ত ক্লান্তি ও দুর্বলতা: লিভার ঠিকমতো কাজ না করলে শরীর শক্তি উৎপাদনে ব্যর্থ হয়, ফলে ক্লান্তি লেগে থাকে।
  • পেটের উপরের অংশে ব্যথা বা অস্বস্তি: বিশেষ করে ডান পাঁজরের নিচে (লিভারের এলাকায়) ব্যথা হতে পারে, যা হেপাটাইটিস বা পিত্তথলির পাথরের কারণে হতে পারে।
  • জ্বর: ভাইরাল হেপাটাইটিসের কারণে জ্বর আসতে পারে, বিশেষ করে হেপাটাইটিস এ ও বি-তে।
  • ওজন কমে যাওয়া ও ক্ষুধামান্দ্য: দীর্ঘস্থায়ী লিভারের সমস্যা থাকলে অরুচি ও ওজন কমে যেতে পারে।
  • পেট ফোলা (অ্যাসাইটিস): উন্নত লিভার সিরোসিসের ক্ষেত্রে পেটে পানি জমতে পারে, যা জন্ডিসের সাথে থাকলে তা জরুরি অবস্থা নির্দেশ করে।

এসব লক্ষণ দেখা দিলে সাধারণ একজন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। আপনি কুমিল্লায় মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার খুঁজুন থেকে একজন বিশেষজ্ঞের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে পারেন।

জন্ডিসের ধরন অনুযায়ী লক্ষণের পার্থক্য

জন্ডিসের তিনটি প্রধান ধরন রয়েছে — প্রি-হেপাটিক (হিমোলাইটিক), হেপাটিক (লিভারজনিত) এবং পোস্ট-হেপাটিক (অবস্ট্রাকটিভ বা পিত্তনালীর বাধাজনিত)। প্রতিটি ধরনের লক্ষণ কিছুটা ভিন্ন হয়। নিচের সারণিতে এই তিন ধরনের জন্ডিসের লক্ষণগত পার্থক্য দেখানো হলো:

জন্ডিসের ধরন অনুযায়ী লক্ষণের পার্থক্য
ধরন কারণ ত্বকের রং প্রস্রাবের রং মলের রং অন্যান্য লক্ষণ
প্রি-হেপাটিক (হিমোলাইটিক) লাল রক্তকণিকার অতিরিক্ত ভাঙন (যেমন থ্যালাসেমিয়া, ম্যালেরিয়া, ওষুধের প্রতিক্রিয়া) হালকা হলুদ (লেবুর খোসার মতো) গাঢ় কিন্তু সাধারণত লালচে বা বাদামি নয় স্বাভাবিক গাঢ় রক্তশূন্যতা (ফ্যাকাশে ভাব), দুর্বলতা, প্লীহা বড় হতে পারে
হেপাটিক (লিভারজনিত) ভাইরাল হেপাটাইটিস (এ, বি, সি), এলকোহলিক লিভার ডিজিজ, সিরোসিস, ওষুধের বিষক্রিয়া কমলা-হলুদ গাঢ় বাদামি (চায়ের মতো) স্বাভাবিক বা হালকা ফ্যাকাশে ক্লান্তি, বমি ভাব, পেটে ব্যথা, জ্বর, ক্ষুধামান্দ্য
পোস্ট-হেপাটিক (অবস্ট্রাকটিভ) পিত্তথলির পাথর, পিত্তনালীর টিউমার, পিত্তনালী সরু হয়ে যাওয়া গাঢ় সবুজাভ-হলুদ গাঢ় বাদামি (বিয়ারের মতো) ফ্যাকাশে (মাটির রঙের বা সাদা) ত্বকের চুলকানি, পেটের ডানদিকে প্রচণ্ড ব্যথা, জ্বর ও ঠান্ডা লাগা (সংক্রমণ থাকলে)

লক্ষণগুলো বুঝতে পারলে কোন ধরনের জন্ডিস হতে পারে তা প্রাথমিকভাবে আন্দাজ করা যায়, তবে নিশ্চিত হতে চিকিৎসকের পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করা জরুরি। জন্ডিসের কারণ যদি রক্তকণিকা ভাঙন হয়, তাহলে কুমিল্লায় জনপ্রিয় রক্তরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার-এর পরামর্শ প্রয়োজন হতে পারে। আর পিত্তনালীর বাধার সন্দেহ হলে কুমিল্লায় ভেরিফাইড জেনারেল সার্জন ডাক্তার-এর কাছে যেতে পারেন।

কখন দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে?

জন্ডিস নিজে সাধারণত জীবন-হুমকি নয়, তবে এর অন্তর্নিহিত কারণ গুরুতর হতে পারে। নিচের পরিস্থিতিতে দেরি না করে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত:

  • উচ্চ জ্বর ও ঠান্ডা লাগা: বিশেষ করে যদি পেটে ব্যথা থাকে — এটি পিত্তনালীর সংক্রমণ (কোলাঞ্জাইটিস) বা হেপাটাইটিসের গুরুতর রূপ নির্দেশ করতে পারে।
  • প্রচণ্ড পেট ব্যথা: বিশেষ করে ডান পাঁজরের নিচে বা পেটের উপরের অংশে — পিত্তথলির পাথর বা পিত্তাশয়ের প্রদাহের লক্ষণ।
  • বিভ্রান্তি বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়া: এটি লিভার ফেইলিওরের একটি গুরুতর লক্ষণ (হেপাটিক এনসেফালোপ্যাথি) যা জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন।
  • নবজাতকের জন্ডিস: সাধারণত জন্মের পর ২-৩ দিনে শুরু হয় এবং ১-২ সপ্তাহে কমে যায়। কিন্তু যদি জন্ডিস ২ সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হয়, শিশু অলস হয়ে যায় (খাওয়াতে চায় না), অথবা প্রস্রাব খুব গাঢ় হয়, তাহলে দ্রুত কুমিল্লায় শিশু বিশেষজ্ঞ বিশেষজ্ঞ-এর পরামর্শ নিন। অতিরিক্ত বিলিরুবিন শিশুর মস্তিষ্কের ক্ষতি করতে পারে (কার্নিক্টেরাস) যা প্রতিরোধযোগ্য।
  • পেট ফুলে যাওয়া বা বমি রক্ত (হেমেটেমেসিস): এটি লিভারের শেষ পর্যায়ের রোগ নির্দেশ করে।

উপরে উল্লেখিত যেকোনো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যান অথবা কুমিল্লায় ভেরিফাইড ডাক্তার ডাক্তার-এর তালিকা থেকে একজন বিশেষজ্ঞের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিন। মনে রাখবেন, জন্ডিসের সঠিক চিকিৎসা নির্ভর করে কারণ চিহ্নিত করার উপর; ঘরোয়া টোটকা বা নিজে নিজে ওষুধ খেয়ে সময় নষ্ট করবেন না।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

জন্ডিসের প্রাথমিক লক্ষণ কি চোখ বা ত্বক হলুদ হওয়ার আগেই বোঝা যায়?

হ্যাঁ, কিছু ক্ষেত্রে ত্বক বা চোখ স্পষ্টভাবে হলুদ হওয়ার আগেই জন্ডিসের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। বিশেষ করে প্রস্রাবের রঙ গাঢ় হলুদ বা চা-এর মতো হয়ে যাওয়া একটি প্রাথমিক লক্ষণ হতে পারে। এছাড়া ক্লান্তি, হালকা জ্বর, পেটের ডান পাশে অস্বস্তি বা বমি বমি ভাব থাকতে পারে। তবে নিশ্চিত হতে রক্তের বিলিরুবিন পরীক্ষা করানো জরুরি। নিজে থেকে শুধু প্রস্রাবের রঙ দেখে জন্ডিস ধরে নেওয়া ঠিক নয়, কারণ পানিশূন্যতা বা অন্য কারণেও প্রস্রাব গাঢ় হতে পারে।

জন্ডিস কি সংক্রামক? পরিবারের অন্য সদস্যদের সতর্ক থাকতে হবে?

জন্ডিস নিজে সংক্রামক নয়, তবে যে রোগের কারণে জন্ডিস হয়েছে সেটি সংক্রামক হতে পারে। যেমন ভাইরাল হেপাটাইটিস এ ও ই খাবার ও পানির মাধ্যমে ছড়ায়, আর হেপাটাইটিস বি ও সি রক্ত ও শারীরিক তরলের মাধ্যমে ছড়ায়। তাই জন্ডিসের রোগীকে শনাক্ত করে অন্তর্নিহিত কারণ নির্ণয় করা জরুরি। হেপাটাইটিস এ থাকলে আলাদা খাবার ও পাত্র ব্যবহার, ভালোভাবে হাত ধোয়া এবং টয়লেট পরিষ্কার রাখা প্রয়োজন। তবে পিত্তথলির পাথর বা ওষুধজনিত জন্ডিস সংক্রামক নয়। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সতর্কতা নেওয়াই উত্তম।

ঘরোয়া উপায়ে কি জন্ডিস সেরে যায়? ডাক্তার দেখানো ছাড়া কি করা যাবে?

জন্ডিসের কিছু সাধারণ ধরন, যেমন নবজাতকের শারীরবৃত্তীয় জন্ডিস বা হালকা হেপাটাইটিস এ, নিজে থেকেই সেরে যেতে পারে। কিন্তু ঘরোয়া উপায় যেমন ইক্ষুর রস, পেয়ারা পাতা বা বিভিন্ন ভেষজ খেয়ে জন্ডিস সারানোর চেষ্টা বিপজ্জনক হতে পারে। কারণ জন্ডিসের পেছনে লিভারের গুরুতর সমস্যা, পিত্তনালিতে বাধা বা হেপাটাইটিস বি/সি-এর মতো দীর্ঘমেয়াদি সংক্রমণ থাকতে পারে। সঠিক রোগ নির্ণয় ছাড়া ঘরোয়া চিকিৎসা করলে আসল রোগ ধরা পড়তে দেরি হয়ে যায় এবং লিভার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই জন্ডিসের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত একজন রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানোই নিরাপদ।

তথ্যসূত্র

উপরের তথ্যসূত্রগুলো আন্তর্জাতিক জার্নাল, সরকারি স্বাস্থ্য সংস্থা বা স্বীকৃত চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া: