কিডনিতে পাথরের লক্ষণ কী?
বাংলাদেশে অনেকেই কোমর বা পেটের ব্যথাকে গ্যাস্ট্রিক বা পিঠের ব্যথা ভেবে বসে থাকেন, কিন্তু আসলে তা কিডনিতে পাথরের কারণে হতে পারে। এই নিবন্ধে আমরা কিডনিতে পাথরের সাধারণ লক্ষণ, ব্যথার ধরন এবং কখন জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে তা সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করব। মনে রাখবেন, শুধু লক্ষণ দেখে নিজে রোগ নির্ণয় করা ঠিক নয়—সঠিক পরীক্ষা (যেমন আল্ট্রাসাউন্ড, সিটি স্ক্যান, প্রস্রাব পরীক্ষা) ছাড়া নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়।
কিডনিতে পাথরের সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণ: তীব্র কোমরের ব্যথা
কিডনিতে পাথরের সবচেয়ে চেনা লক্ষণ হলো কোমর বা পিঠের একপাশে হঠাৎ করে তীব্র ব্যথা। এই ব্যথাকে চিকিৎসা ভাষায় ‘রেনাল কোলিক’ বলে। ব্যথাটি সাধারণত পাঁজরের নিচ থেকে শুরু হয়ে কোমরের দিকে আসে এবং ঢেউয়ের মতো আসা-যাওয়া করে—কখনো খুব তীব্র, কখনো কিছুটা কম। অনেক সময় ব্যথা কুঁচকি বা তলপেটের দিকেও ছড়িয়ে পড়ে।
এই ব্যথার বিশেষত্ব হলো এটি একটানা থাকে না, বরং কিছুক্ষণ পর পর বেড়ে যায়। পাথরটি যখন মূত্রনালিতে আটকে যায় এবং প্রস্রাবের প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে, তখনই তীব্র ব্যথা হয়। ব্যথার তীব্রতা এত বেশি হতে পারে যে রোগী স্থির থাকতে পারেন না, চিৎকার করে উঠতে পারেন।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: এই ব্যথা অনেক সময় গ্যাস্ট্রিকের ব্যথা বা পিঠের মাংসপেশির ব্যথার সাথে মিশে যায়। তবে কিডনির ব্যথা সাধারণত একপাশে হয় এবং এর সাথে প্রস্রাবের সমস্যা থাকতে পারে। যদি আপনার কোমরের ব্যথা বারবার হয় এবং সাথে প্রস্রাবে রক্ত বা জ্বালা থাকে, তবে দেরি না করে একজন কুমিল্লায় মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার-এর পরামর্শ নিন।
প্রস্রাবের মাধ্যমে যে লক্ষণগুলো দেখা যায়
কিডনিতে পাথর থাকলে প্রস্রাবের মাধ্যমেও বেশ কিছু লক্ষণ প্রকাশ পায়। সবচেয়ে সাধারণ হলো প্রস্রাবে রক্ত আসা (হেমাটুরিয়া)। রক্তের পরিমাণ কম বা বেশি হতে পারে—কখনো প্রস্রাব গোলাপি বা লাল দেখা যায়, আবার কখনো শুধু মাইক্রোস্কোপের নিচে ধরা পড়ে।
অনেক রোগী ঘন ঘন প্রস্রাবের চাপ অনুভব করেন, বিশেষ করে যখন পাথরটি মূত্রনালির নিচের দিকে নেমে আসে। প্রস্রাব শুরু করতে অসুবিধা, প্রস্রাবের সময় জ্বালাপোড়া বা ব্যথাও হতে পারে। এই লক্ষণগুলো মূত্রনালির সংক্রমণের (UTI) মতোই, কিন্তু পাথরের কারণেও হতে পারে।
যদি প্রস্রাবে রক্ত দেখেন বা প্রস্রাব করতে কষ্ট হয়, তবে একজন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। আপনি কুমিল্লায় শিশু বিশেষজ্ঞ বা প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য মেডিসিন বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হতে পারেন। মনে রাখবেন, প্রস্রাবের জ্বালা বা রক্ত সবসময় পাথরের কারণে নাও হতে পারে, তাই সঠিক পরীক্ষা করানো প্রয়োজন।
বমি বমি ভাব ও বমি কেন হয়?
অনেক কিডনি পাথরের রোগী তীব্র ব্যথার সময় বমি বমি ভাব বা বমি অনুভব করেন। এটি সরাসরি পাথরের কারণে নয়, বরং ব্যথার প্রতিক্রিয়ায় স্নায়ুতন্ত্রের একটি স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। প্রচণ্ড ব্যথায় পেটের পেশি সংকুচিত হয়ে যায় এবং বমির কেন্দ্র উদ্দীপ্ত হয়।
বমি বমি ভাব থাকলে খাবার গ্রহণ কঠিন হয়ে পড়ে, যা দুর্বলতা বাড়াতে পারে। তবে এই লক্ষণ একা কিডনি পাথর নিশ্চিত করে না—গ্যাস্ট্রিক আলসার বা প্যানক্রিয়াটাইটিসের কারণেও হতে পারে। তাই বমি ও ব্যথা একসাথে থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
জ্বর বা ঠান্ডা লাগা: কখন জরুরি বিভাগে যাবেন?
কিডনিতে পাথরের সাথে যদি জ্বর বা ঠান্ডা লাগা দেখা দেয়, তবে এটি একটি জরুরি অবস্থার ইঙ্গিত। এর অর্থ হতে পারে পাথরের কারণে মূত্রনালিতে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে, যা কিডনিতে সংক্রমণ (পাইলোনেফ্রাইটিস) সৃষ্টি করতে পারে।
এক্ষেত্রে দেরি না করে দ্রুত নিকটস্থ জরুরি বিভাগে যেতে হবে। জ্বরের সাথে প্রচণ্ড কোমর ব্যথা, বমি বা প্রস্রাব বন্ধ হয়ে যাওয়া—এসব একসাথে থাকলে জীবন বিপন্ন হতে পারে। মনে রাখবেন, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে না আনলে কিডনি স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
নীরব পাথর ও অন্যান্য সমস্যা থেকে পার্থক্য
সব কিডনি পাথরই ব্যথা দেয় না। কিছু পাথর (বিশেষ করে ছোট বা মসৃণ) কোনো লক্ষণই তৈরি করে না—এগুলোকে ‘নীরব পাথর’ বলে। এ ধরনের পাথর সাধারণত রুটিন আল্ট্রাসাউন্ড বা অন্যান্য পরীক্ষার সময় ধরা পড়ে। অন্যদিকে, কিছু লক্ষণ যেমন প্রস্রাবে জ্বালা বা পেট ফোলা—এগুলো মূত্রনালির সংক্রমণ (UTI), পিঠের মাংসপেশির ব্যথা বা গ্যাস্ট্রিকের ব্যথার সাথে গুলিয়ে ফেলা যায়। নিচের টেবিলে পার্থক্যগুলো দেখানো হলো:
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
নিচের যেকোনো একটি লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন:
- প্রচণ্ড কোমর ব্যথা যা বিশ্রামে কমছে না
- প্রস্রাবে রক্ত (লাল বা গোলাপি)
- জ্বর বা ঠান্ডা লাগা
- প্রস্রাব করতে না পারা বা প্রস্রাব বন্ধ হয়ে যাওয়া
- বমি বমি ভাব ও বমির সাথে ব্যথা
- ব্যথা এত বেশি যে স্বাভাবিক কাজকর্ম করতে পারছেন না
তবে মনে রাখবেন, কিডনিতে পাথর সবসময় জরুরি নয়। ছোট পাথর নিজে থেকেই বেরিয়ে যেতে পারে। কিন্তু লক্ষণ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ বা ঘরোয়া পদ্ধতি ব্যবহার করবেন না। লেবুপানি বা ভেষজ দিয়ে পাথর গলানোর দাবি অপ্রমাণিত—এড়িয়ে চলুন।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
পেটের ব্যথা নাকি কিডনির পাথরের ব্যথা – পার্থক্য বুঝবেন কীভাবে?
পেটের গ্যাস্ট্রিক বা আলসারের ব্যথা সাধারণত উপরের পেটে বা মাঝখানে জ্বালা ধরিয়ে দীর্ঘস্থায়ী হয়, খাওয়ার পর বাড়তে পারে। অন্যদিকে কিডনিতে পাথরের ব্যথা সাধারণত একপাশের কোমর থেকে শুরু হয়ে তলপেট ও উরুর দিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং তরঙ্গের মতো (wave-like) এসে থামে – একে বলে ‘রেনাল কলিক’। এই ব্যথা এত তীব্র হয় যে রোগী শান্ত হয়ে বসতে পারেন না, বারবার নড়াচড়া করতে থাকেন। গ্যাস্ট্রিকের ব্যথায় সাধারণত এমন তীব্র তরঙ্গ দেখা যায় না। তবে চূড়ান্ত পার্থক্য করতে ডাক্তার ও আল্ট্রাসাউন্ড বা সিটি স্ক্যান প্রয়োজন। ব্যথা সহ্য না হলে দেরি না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন।
প্রস্রাবে রক্ত না থাকলেও কি কিডনিতে পাথর হতে পারে?
হ্যাঁ, হতে পারে। প্রস্রাবে রক্ত যাওয়া (হেমাটুরিয়া) কিডনি পাথরের একটি সাধারণ লক্ষণ, কিন্তু সব সময় দেখা যায় না। অনেক পাথর (বিশেষ করে ছোট বা নীরব পাথর) প্রস্রাবে রক্ত ছাড়াই থাকে। আবার পাথরটি যদি মূত্রনালির কোনো অংশ পুরোপুরি বন্ধ না করে, তাহলে রক্ত বের নাও আসতে পারে। তাই শুধু প্রস্রাবে রক্ত নেই বলে কিডনিতে পাথর নেই ভাবা ঠিক নয়। যদি কোমরে ব্যথা, প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া বা ঘন ঘন প্রস্রাবের মতো অন্যান্য উপসর্গ থাকে, তাহলে আল্ট্রাসাউন্ড বা প্রস্রাব পরীক্ষা করিয়ে নিশ্চিত হওয়া জরুরি।
কিডনির পাথরের ব্যথা কি কয়েক মিনিটের জন্য এসে আবার চলে যেতে পারে?
হ্যাঁ, কিডনির পাথরের ব্যথা প্রায়ই তরঙ্গ আকারে আসে – কয়েক মিনিট থেকে ঘন্টা পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে, তারপর কিছুক্ষণের জন্য কমে যায়। এটি পাথরটি মূত্রনালির মধ্যে নড়াচড়া করলে বা আটকে গেলে আরও তীব্র হয়। তবে ব্যথা চলে গেলেই পাথর সেরে গেছে ভাববেন না। পাথরটি স্থান পরিবর্তন করে কিছুক্ষণের জন্য অস্বস্তি কমাতে পারে, কিন্তু এটি নিজে থেকে দ্রুত বের না হলে আবার ব্যথা ফিরে আসে। ব্যথা মাঝে মাঝে কমে গেলেও দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা এড়াতে ডাক্তারি পরীক্ষা ও পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
এলাকার ডাক্তার খুঁজুন
তথ্যসূত্র
উপরের তথ্যসূত্রগুলো আন্তর্জাতিক জার্নাল, সরকারি স্বাস্থ্য সংস্থা বা স্বীকৃত চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া:
- Kidney stones – NHS (nhs.uk)
- Kidney stones – Symptoms and causes – Mayo Clinic (mayoclinic.org)
- Kidney Stones – Cleveland Clinic (my.clevelandclinic.org)
- Kidney Stones – NIDDK (NIH) (niddk.nih.gov)
- World Health Organization — কিডনিতে পাথরের লক্ষণ কী? (who.int)
- MedlinePlus — কিডনিতে পাথরের লক্ষণ কী? (medlineplus.gov)
