স্ট্রোক হলে প্রথমে কী করবেন?

Rate this post

স্ট্রোক এমন একটি জরুরি অবস্থা, যেখানে মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে বা রক্তক্ষরণ হলে কোষগুলো দ্রুত মারা যেতে শুরু করে। তাই রোগীকে হাসপাতালে পৌঁছাতে যত দেরি হয়, স্থায়ী অক্ষমতা বা জীবন হারানোর ঝুঁকি ততই বেড়ে যায়। যে মুহূর্তে স্ট্রোকের লক্ষণ চোখে পড়বে, আশপাশের মানুষের দ্রুত সিদ্ধান্তই রোগীর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।

এই নিবন্ধটি মূলত সেই মুহূর্তের জন্য—যখন আপনাকে রোগীর পাশে দাঁড়িয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। লক্ষণ কীভাবে চিনবেন, কার সঙ্গে যোগাযোগ করবেন এবং হাসপাতালে পৌঁছানোর আগে কোন কাজগুলো করা উচিত বা উচিত নয়—সবকিছু ধাপে ধাপে তুলে ধরা হলো।

স্ট্রোক কী এবং কেন সময় গুরুত্বপূর্ণ?

মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহ হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলে বা মস্তিষ্কের ভেতরে রক্তক্ষরণ হলে তাকে স্ট্রোক বলে। রক্তে অক্সিজেন ও পুষ্টি না পৌঁছানোর কারণে মস্তিষ্কের কোষগুলো মিনিটের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে। এ কারণেই স্ট্রোকের চিকিৎসায় সময়ের চেয়ে মূল্যবান আর কিছু নেই—যত দেরি, তত বেশি ক্ষতি।

স্ট্রোকের প্রধান দুই ধরন—রক্তনালি বন্ধ হয়ে যাওয়া (ইসকেমিক স্ট্রোক) এবং রক্তনালি ছিঁড়ে রক্তক্ষরণ (হেমোরেজিক স্ট্রোক)। বাইরে থেকে দুটি ধরনের লক্ষণ প্রায় একই রকম দেখালেও চিকিৎসা সম্পূর্ণ ভিন্ন। কোন ধরনের স্ট্রোক হয়েছে তা বোঝার জন্য হাসপাতালে সিটি স্ক্যান বা এমআরআই প্রয়োজন। তাই জরুরি বিভাগে রোগী না পৌঁছানো পর্যন্ত তাকে নিজে থেকে কোনো ওষুধ খাওয়ানো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

একই কারণে ঘরোয়া প্রতিকার বা বিকল্প চিকিৎসার পেছনে সময় নষ্ট করা রোগীর জীবনকে আরও বড় বিপদের দিকে ঠেলে দিতে পারে। স্ট্রোক সামলানোর একমাত্র সঠিক পথ হলো দ্রুত লক্ষণ শনাক্ত করে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে পৌঁছে দেওয়া।

FAST পদ্ধতিতে স্ট্রোক শনাক্ত করুন

স্ট্রোকের লক্ষণ হঠাৎ করেই প্রকাশ পায়। রোগীকে নিয়ে বিভ্রান্ত না হয়ে FAST পদ্ধতিতে ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে পরীক্ষা করে দেখুন। বাংলায় একে সহজভাবে মুখ–হাত–কথা–সময় বলেও মনে রাখতে পারেন।

স্ট্রোক শনাক্তকরণ: FAST পদ্ধতি
FAST উপাদান কী দেখবেন কী করবেন
F — Face (মুখ) রোগীকে হাসতে বলুন। মুখের এক পাশ বেঁকে গেছে বা নিচে নেমে গেছে কি না দেখুন। লক্ষণ ধরা পড়লেই জরুরি নম্বরে ফোন করুন।
A — Arm (হাত) রোগীকে দুই হাত ওপরে তুলতে বলুন। একটি হাত দুর্বল হয়ে নিচে পড়ে যাচ্ছে কি না দেখুন। রোগীকে জোর করে হাত তুলতে বাধ্য করবেন না।
S — Speech (কথা) রোগীকে একটি সাধারণ বাক্য বলতে বলুন, যেমন—আজ আবহাওয়া ভালো। কথা জড়িয়ে যাচ্ছে বা শব্দ বোঝা যাচ্ছে না কি না লক্ষ করুন। ধৈর্য ধরে শুনুন; রোগীকে নিয়ে চিন্তিত না হয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নিন।
T — Time (সময়) লক্ষণগুলো ঠিক কখন শুরু হয়েছে তা মনে রাখুন বা লিখে নিন। এখনই ৯৯৯ বা নিকটস্থ হাসপাতালে খবর দিন।

সব সময় সব লক্ষণ একসঙ্গে দেখা যায় না। শুধু মুখ বেঁকে যাওয়া, শুধু একটি হাত দুর্বল হয়ে যাওয়া বা শুধু কথা জড়িয়ে যাওয়া—এগুলোর যেকোনো একটি হঠাৎ প্রকাশ পেলেও স্ট্রোক হিসেবে ধরে নিতে হবে। একইভাবে হঠাৎ দৃষ্টি ঝাপসা, তীব্র মাথাব্যথা, মাথা ঘোরা বা ভারসাম্য হারানোও স্ট্রোকের লক্ষণ হতে পারে।

জরুরি নম্বরে ফোন করুন: ৯৯৯ বা হাসপাতালে যোগাযোগ

স্ট্রোকের লক্ষণ চোখে পড়ামাত্রই ৯৯৯ নম্বরে ফোন করুন। জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ থেকে দ্রুত অ্যাম্বুলেন্স ও প্রয়োজনীয় নির্দেশনা পাওয়া যায়। লক্ষণ নিজে থেকে ভালো হয়ে যাবে—এই আশায় এক মুহূর্তও অপেক্ষা করা মারাত্মক বিপদের কারণ হতে পারে।

নিজে গাড়ি চালিয়ে রোগীকে হাসপাতালে নেওয়ার তাড়াহুড়ো না করাই ভালো। পথে রোগীর অবস্থা হঠাৎ খারাপ হতে পারে—বমি, খিঁচুনি বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়া—তখন প্রশিক্ষিত সহায়তা ছাড়া সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে। ৯৯৯-এ ফোন করা সম্ভব না হলে নিকটস্থ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে সরাসরি ফোন করে জানিয়ে দিন যে স্ট্রোকের রোগী আসছে, যেন হাসপাতাল আগে থেকেই প্রস্তুত থাকতে পারে।

হাসপাতালে পৌঁছে চিকিৎসককে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে তথ্যটি জানাতে হবে, তা হলো—লক্ষণ কখন শুরু হয়েছে। কিছু ওষুধ কেবলমাত্র লক্ষণ শুরুর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ করে। সাথে রোগীর বয়স, আগে থেকে থাকা রোগ (উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ) এবং চলমান ওষুধের নামও জানাতে হবে।

স্ট্রোকের পরবর্তী চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও ভবিষ্যতে স্ট্রোক প্রতিরোধে স্নায়ুরোগ (নিউরোলজি) বিভাগের চিকিৎসকের পরামর্শ গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজনে কুমিল্লায় স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার খুঁজে আগে থেকে জেনে রাখতে পারেন—তবে আপৎকালীন মুহূর্তে প্রথম কাজ হলো রোগীকে নিকটস্থ হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়া।

স্ট্রোক হলে কী করবেন এবং কী করবেন না

হাসপাতালে পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত রোগীর পাশে থেকে কোন কাজগুলো করবেন আর কোনগুলো একদম করবেন না—চার্ট করে দেখে নিন।

স্ট্রোকের প্রাথমিক চিকিৎসায় করণীয় ও বর্জনীয়
করণীয় বর্জনীয়
৯৯৯ বা হাসপাতালের জরুরি নম্বরে দ্রুত ফোন করুন। খাবার, পানি, চা বা কফি দেবেন না।
রোগীকে নিরাপদ জায়গায় শুইয়ে মাথা সামান্য উঁচু করে রাখুন। এসপিরিন বা রক্তচাপের ওষুধ নিজে থেকে খাওয়াবেন না।
শার্টের কলার, টাই, বেল্টসহ ঢিলেঢালা পোশাক খুলে দিন। রোগীকে ঝাঁকাবেন না বা গালে চাপ দিয়ে জাগানোর চেষ্টা করবেন না।
রোগী অজ্ঞান বা বমি করলে কাত করে শুইয়ে দিন (রিকভারি পজিশন)। ঠান্ডা পানি মাখা, পা টানা বা ঘরোয়া প্রতিকারের চেষ্টা করবেন না।
লক্ষণ শুরুর সময় লিখে রাখুন এবং রোগীকে শান্ত রাখুন। ঘুম নিলে ঠিক হয়ে যাবে—ভেবে অপেক্ষা করবেন না।

খাবার বা পানি দেবেন না: স্ট্রোকে রোগীর গিলার ক্ষমতা কমে যেতে পারে। খাবার বা পানি খেতে দিলে তা শ্বাসনালিতে চলে গিয়ে শ্বাসরোধ বা ফুসফুসে সংক্রমণ (নিউমোনিয়া) হতে পারে। ওষুধের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম—গিলতে না পারলে ওষুধ শ্বাসনালিতে আটকে যেতে পারে।

এসপিরিন বা রক্তচাপের ওষুধ নয়: রোগীকে নিজে থেকে এসপিরিন খাওয়ানো বিপজ্জনক। স্ট্রোক রক্তক্ষরণজনিত হলে এসপিরিন রক্তপাত আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। একইভাবে রক্তচাপ বেড়েছে দেখে নিজে কোনো ওষুধ খাওয়াবেন না—প্রাথমিক পর্যায়ে সামান্য বাড়তি রক্তচাপ মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহ রাখতে সহায়কও হতে পারে। এসব ওষুধ কেবল চিকিৎসকের পরীক্ষা ও নির্দেশনা অনুযায়ী দিতে হয়।

কাত করে শুইয়ে দিন: রোগী অজ্ঞান হলে বা বমি করলে তাকে পুরোপুরি চিৎ করে না শুইয়ে এক পাশ কাত করে দিন—যাতে বমি বা লালা মুখ থেকে বেরিয়ে যেতে পারে এবং শ্বাসনালি পরিষ্কার থাকে। রোগী জ্ঞান হারালে নাড়ি ও শ্বাস নিয়মিত আছে কি না দেখুন। শ্বাস বন্ধ হয়ে গেলে প্রশিক্ষিত কেউ থাকলে সিপিআর শুরু করুন এবং ফোনে নির্দেশনা নিন।

মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত স্ট্রোকে অনেক সময় অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে। জরুরি বিভাগের চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনে কুমিল্লায় নিউরোসার্জন ডাক্তার দেখানোর ব্যবস্থা করা যায়।

লক্ষণ চলে গেলেও কেন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?

কখনো কখনো স্ট্রোকের লক্ষণ কয়েক মিনিট বা কয়েক ঘণ্টার মধ্যে নিজে থেকেই সেরে যায়। একে ট্রানজিয়েন্ট ইস্কেমিক অ্যাটাক (টিআইএ) বা মিনি-স্ট্রোক বলে। লক্ষণ ভালো হয়ে গেছে দেখে স্বস্তি বোধ করার কিছু নেই—টিআইএ মূলত ভবিষ্যতে বড় স্ট্রোকের সতর্কবার্তা। যাদের একবার টিআইএ হয়েছে, তাদের সামনের দিনগুলোতে বড় স্ট্রোকের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বেড়ে যায়।

কখন ডাক্তার দেখাবেন?

  • স্ট্রোকের যেকোনো লক্ষণ দেখা দিলেই—তা কয়েক মিনিটে সেরে গেলেও।
  • লক্ষণ চলে যাওয়ার পরও রোগীর মাথা ঘোরা, দুর্বলতা বা অসংলগ্ন আচরণ থাকলে।
  • উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস বা হৃদরোগ নিয়ন্ত্রণে না থাকলে।

উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, কোলেস্টেরল, ধূমপান ও হৃদরোগ—এই ঝুঁকিগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখলে স্ট্রোক অনেকটা প্রতিরোধ করা সম্ভব। আগে থেকে এ ধরনের রোগ থাকলে নিয়মিত চিকিৎসা ও পরীক্ষা করাতে হবে। স্ট্রোকের ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে কুমিল্লায় মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দেখিয়ে নির্দিষ্ট ব্যবধানে চেকআপ করাতে পারেন। হৃদস্পন্দন অনিয়মিত (অ্যাট্রিয়াল ফিব্রিলেশন) বা অন্য হৃদরোগ থাকলে কুমিল্লায় হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দেখিয়ে চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।

স্ট্রোকের পর শুধু ওষুধই যথেষ্ট নয়—পুনর্বাসনও অত্যন্ত জরুরি। হাত-পা চলাচল, কথাবার্তা ও দৈনন্দিন কাজের দক্ষতা ফিরিয়ে আনতে ফিজিওথেরাপি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী কুমিল্লায় ফিজিওথেরাপিস্ট বিশেষজ্ঞ খুঁজে নিয়মিত থেরাপি চালিয়ে যাওয়া দরকার। যে বিভাগের চিকিৎসকই প্রয়োজন হোক, কুমিল্লার ডাক্তার ডিরেক্টরি থেকে আগে থেকেই যোগাযোগের নম্বর সংগ্রহ করে রাখলে আপৎকালীন সময়ে কাজে লাগবে।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

স্ট্রোকের রোগীকে কি পানি বা খাবার দেওয়া উচিত?

না, স্ট্রোকের সন্দেহ হলে রোগীকে কিছু খেতে বা পান করতে দেবেন না। স্ট্রোকে আক্রান্ত ব্যক্তির গিলতে সমস্যা হতে পারে, ফলে পানি বা খাবার শ্বাসনালীতে চলে গিয়ে দম বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে। চিকিৎসকের নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত রোগীকে সম্পূর্ণ খালি পেটে রাখাই নিরাপদ।

স্ট্রোকের লক্ষণ কিছুক্ষণের মধ্যে নিজে থেকেই ঠিক হয়ে গেলেও কি হাসপাতালে যাওয়া জরুরি?

অবশ্যই জরুরি। লক্ষণ সাময়িকভাবে চলে গেলেও এটি ট্রানজিয়েন্ট ইস্কেমিক অ্যাটাক (টিআইএ) বা ‘মিনি স্ট্রোক’ হতে পারে, যা বড় স্ট্রোকের পূর্বসূরি। গবেষণায় দেখা গেছে, টিআইএ-র পর ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে বড় স্ট্রোকের ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। তাই লক্ষণ পুরোপুরি চলে গেলেও দ্রুত হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

স্ট্রোক রোগীকে নিজের গাড়িতে হাসপাতালে নেওয়া কি ঠিক, নাকি অ্যাম্বুলেন্স ডাকা উচিত?

সর্বোত্তম উপায় হলো ৯৯৯-এ ফোন করে অ্যাম্বুলেন্স ডাকা। অ্যাম্বুলেন্সের ভেতরে প্রশিক্ষিত কর্মীরা রোগীকে সঠিকভাবে সরাতে পারেন, প্রয়োজনে প্রাথমিক চিকিৎসা দিতে পারেন এবং হাসপাতালে আগেই জানিয়ে দিতে পারেন। নিজের গাড়িতে নিলে রোগীর অবস্থা খারাপ হতে পারে, বিশেষ করে মাথা ও ঘাড়ের ভুল নড়াচড়ায়। যদি কোনোভাবেই অ্যাম্বুলেন্স না পাওয়া যায়, তবে রোগীকে চ্যাট করে শুইয়ে, মাথা ও ঘাড় সোজা রেখে, ঝাঁকুনি এড়িয়ে ধীরে ও সাবধানে নিয়ে যান।

তথ্যসূত্র

উপরের তথ্যসূত্রগুলো আন্তর্জাতিক জার্নাল, সরকারি স্বাস্থ্য সংস্থা বা স্বীকৃত চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া: