শিশুর শ্বাসকষ্ট হলে কী করবেন?

Rate this post

শিশুর শ্বাসকষ্ট একটি জরুরি অবস্থা। দ্রুত সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া শিশুর জীবন বাঁচাতে পারে। এই নিবন্ধে আমরা ধাপে ধাপে জানাব কী করবেন, কী করবেন না, কখন অবিলম্বে হাসপাতালে যেতে হবে এবং সাধারণ কারণগুলো কী কী। প্রতিটি তথ্য সহজবোধ্য ও তাৎক্ষণিক কাজে লাগানোর উপযোগী। মনে রাখবেন: ঘরোয়া প্রতিকার বা দেরি করলে বিপদ হতে পারে। তাই নিচের নির্দেশনাগুলো মনোযোগ দিয়ে পড়ুন।

শিশুর শ্বাসকষ্ট হলে প্রথমে কী করবেন?

শিশুর শ্বাসকষ্ট দেখলেই প্রথম কাজ হলো তাকে শান্ত রাখা। ভয় বা কান্না শ্বাসকষ্ট আরও বাড়িয়ে দেয়। নিজেও আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করুন:

  • শিশুকে সোজা করে কোলে নিন: শুইয়ে না রেখে সোজা অবস্থায় ধরে রাখুন। এতে শ্বাসনালি খোলা থাকে এবং শ্বাস নিতে সুবিধা হয়।
  • জরুরি নম্বরে ফোন করুন: ১৬২৬৩ (জাতীয় স্বাস্থ্য হেল্পলাইন) অথবা ৯৯৯ (জাতীয় জরুরি সেবা) নম্বরে কল করে পরিস্থিতি জানান। তারা যে নির্দেশনা দেবে, সেটি মেনে চলুন।
  • হাসপাতালে যাওয়ার প্রস্তুতি নিন: শিশুকে গাড়িতে তোলার আগে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও টাকা সঙ্গে নিন। আশপাশের কাউকে সাহায্য করতে বলুন।

মনে রাখবেন: শিশুর কোনো কিছু খাওয়া বা পান করানো যাবে না। বুকের ওপর তেল মালিশ, সরিষার তেল গরম করা, বা ঘরোয়া কোনো টোটকা দেওয়া নিষিদ্ধ। শুধু দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছানোটাই লক্ষ্য রাখুন।

কখন বুঝবেন এটি জরুরি অবস্থা?

সব শ্বাসকষ্ট সমান নয়। কিছু লক্ষণ দেখা দিলে বুঝতে হবে এটি জীবন-হুমকি এবং অবিলম্বে হাসপাতালে নেওয়া জরুরি। নিচের টেবিলটি মুখস্থ করার মতো গুরুত্বপূর্ণ।

লক্ষণ কীভাবে বুঝবেন করণীয়
দ্রুত শ্বাস শিশুর শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি দ্রুত হচ্ছে। ২ মাসের কম বয়সে প্রতি মিনিটে ৬০-এর বেশি, ২-১২ মাসে ৫০-এর বেশি, ১-৫ বছরে ৪০-এর বেশি শ্বাস নিলে অত্যন্ত বিপজ্জনক। অবিলম্বে হাসপাতালে নিন।
নাক ফুলানো শ্বাস নেওয়ার সময় নাকের পাশ ফুলে ফুলে ওঠে (nasal flaring)। এটি শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়ার লক্ষণ। দেরি করবেন না।
পাঁজরের নিচে ঢলে পড়া শিশুর বুকের নিচে, পাঁজরের মাঝে চামড়া ভেতরের দিকে ঢুকে যায় (chest retraction)। গুরুতর সংকেত। অবিলম্বে চিকিৎসকের কাছে নিন।
ঠোঁট, জিহ্বা বা নখ নীল হয়ে যাওয়া ঠোঁট বা জিহ্বার রং নীলচে/বেগুনি (cyanosis) দেখলে বুঝবেন অক্সিজেনের মাত্রা কমে গেছে। জরুরি বিভাগে নেওয়ার পথেই ৯৯৯-এ কল জানিয়ে রাখুন।
অজ্ঞান বা অলস হয়ে পড়া শিশু সাড়া দিচ্ছে না, চোখ ঘুরিয়ে ফেলছে, বা অস্বাভাবিক ঘুম পাচ্ছে। ঘুম পাড়ানোর ওষুধ ভেবে বসে থাকবেন না। দ্রুত হাসপাতালে ছুটুন।

উপরের যেকোনো একটি লক্ষণ দেখা দিলে বুঝবেন এটি জরুরি অবস্থা। মাত্র কয়েক মিনিট দেরি বিপদ ডেকে আনতে পারে। তাই উপরের লক্ষণ চিহ্নিত করার পর পরবর্তী সেকশনে বর্ণিত কাজগুলো করুন।

শ্বাসকষ্টের সাধারণ কারণগুলো কী কী?

শিশুর শ্বাসকষ্ট বিভিন্ন কারণে হতে পারে। কারণ জানা থাকলে অভিভাবক দ্রুত সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। তবে মনে রাখবেন: কারণ নির্ণয় ডাক্তারের কাজ। আপনি শুধু জরুরি পদক্ষেপ নিন। সাধারণ কারণগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:

  • নিউমোনিয়া: ফুসফুসের সংক্রমণ। সাধারণত জ্বর, কাশি ও দ্রুত শ্বাস থাকে।
  • ব্রঙ্কিওলাইটিস: ছোট শ্বাসনালির প্রদাহ, বিশেষ করে ২ বছরের কম বয়সে সাধারণ। ভাইরাসজনিত।
  • হাঁপানি (অ্যাজমা): শ্বাসনালি সংকুচিত হয়ে যায়। পরিবারে অ্যাজমার ইতিহাস থাকলে সম্ভাবনা বেশি। প্রাথমিক চিকিৎসার পর দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনার জন্য কুমিল্লায় ভেরিফাইড বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ ডাক্তার এর পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
  • এলার্জি: ধুলোবালি, পশুর লোম, কিছু খাবার বা ওষুধে তীব্র অ্যালার্জি শ্বাসকষ্ট তৈরি করতে পারে।
  • বিদেশি বস্তু: ছোট শিশু খেলনা, বাদাম, কয়েন ইত্যাদি গলায় বা নাকে ফেলে দিলে শ্বাসরোধ হতে পারে। সন্দেহ হলে কুমিল্লায় টপ নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দিয়ে পরীক্ষা করাতে পারেন।

উল্লেখিত কারণগুলোর মধ্যে নিউমোনিয়া ও ব্রঙ্কিওলাইটিসের জন্য সাধারণত জরুরি বিভাগেই প্রাথমিক চিকিৎসা হয়। পরে প্রয়োজনে কুমিল্লায় মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার এর কাছে ফলো-আপ করাতে পারেন।

শ্বাসকষ্টের সময় কী করবেন না?

শ্বাসকষ্টের সময় কয়েকটি কাজ অত্যন্ত বিপজ্জনক। নিচের কাজগুলো কখনোই করবেন না:

  • মুখে বা নাকে কিছু দেবেন না: পানি, দুধ, জুস, কাশির সিরাপ বা অন্য কোনো ওষুধ মুখে দিলে শ্বাসনালিতে চলে গিয়ে শ্বাসরোধ হতে পারে। ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া কিছুই দেবেন না।
  • বুকের ওপর তেল মালিশ বা গরম সেঁক দেবেন না: সরিষার তেল, লবঙ্গ তেল বা অন্য কোনো মালিশ শ্বাসকষ্ট বাড়াতে পারে। বরং ঠান্ডা সংকোচন দিলে রক্তনালি সংকুচিত হয়ে বিপদ বাড়তে পারে।
  • শিশুকে শুইয়ে রাখবেন না: শুইয়ে রাখলে শ্বাসনালি চাপা পড়ে। সোজা করে কোলে বা কাঁধে নিন।
  • বুক চাপা দেবেন না বা কাশি উস্কে দেবেন না: জোরে বুক চাপা দিলে বা জোর করে কাশি করালে শ্বাসনালির রক্তপাত হতে পারে।
  • ঘরোয়া প্রতিকার বা কবিরাজি চিকিৎসায় যাবেন না: নিমপাতা, পুদিনা, আদার রস ইত্যাদির কোনো প্রমাণিত কার্যকারিতা নেই এবং সময় নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বেশি।

মনে রাখবেন: শ্বাসকষ্টের সময় শুধু একটি কাজ করবেন—দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছানো। বাকি সব কাজ ডাক্তারের।

হাসপাতালে নেওয়ার পথে করণীয়

হাসপাতালে যাওয়ার পথে শিশুর অবস্থার অবনতি হলে করণীয় সম্পর্কে আগে থেকে জানা থাকলে আতঙ্ক কমে। নিচের নির্দেশনাগুলো মেনে চলুন:

  • শিশুকে সোজা করে ধরে রাখুন: গাড়িতে বসিয়ে কিংবা কোলে সোজা অবস্থায় রাখুন। মাথা সামান্য উঁচু করে ঘাড় সোজা রাখুন।
  • ঘরের জানালা খুলে রাখুন: যদি বাসায় থাকেন, তবে ঘরের দরজা-জানালা খুলে বাতাস চলাচল স্বাভাবিক রাখুন। গাড়িতে থাকলে জানালা একটু ফাঁকা করে রাখতে পারেন (প্রয়োজনে)।
  • শিশুর গায়ে কাপড় কম দিন: বেশি জামাকাপড় পরালে বা মোটা কম্বলে ঢেকে দিলে শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। হালকা পোশাক পরান।
  • পথে জরুরি নম্বরে কল করে জানিয়ে রাখুন: ১৬২৬৩ বা ৯৯৯-এ কল করে জানিয়ে দিন যে আপনি হাসপাতালে আসছেন এবং শিশুর অবস্থা কেমন। তারা হাসপাতালকে আগেই জানিয়ে রাখতে পারবে।
  • নিজে ওষুধ দেওয়ার চেষ্টা করবেন না: পথে শিশু কিছু খেতে চাইলেও জল বা অন্যের কাছে থাকা ওষুধ দেবেন না। ডাক্তারের অনুমতি ছাড়া কিছুই নয়।

হাসপাতালে পৌঁছে জরুরি বিভাগে দ্রুত জানান যে আপনার শিশুর শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

বাচ্চার শ্বাসকষ্টের ঘরোয়া চিকিৎসা বা স্টিম দেওয়া কি নিরাপদ?

ঘরোয়া স্টিম বা ভাপ বাচ্চার শ্বাসনালিতে পোড়া বা ইনজুরি ঘটাতে পারে, তাই এটি এড়িয়ে চলা ভালো। বাড়িতে শুধুমাত্র বাচ্চাকে সোজা করে কোলে নিয়ে বসানো, ঘরের জানালা খুলে বাতাস চলাচল করা এবং আঁটসাঁট পোশাক ঢিলা করা যেতে পারে। মনে রাখবেন, এগুলো সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু শ্বাসকষ্টের মূল কারণ কিন্তু দূর করে না। ঘরোয়া পদ্ধতিতে সময় নষ্ট না করে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়াই নিরাপদ।

রাতে ঘুমের মধ্যে হঠাৎ শ্বাসকষ্ট শুরু হলে কীভাবে বুঝব হাসপাতালে যাওয়া দরকার কি না?

রাতে লক্ষণগুলো প্রায়ই অল্প অল্প করে শুরু হয়, তাই বাচ্চাকে শোয়ানোর আগে ও ঘুমের মধ্যে অন্তত একবার দেখে নেওয়া ভালো। জরুরি বলে ধরুন যদি: শ্বাস নেওয়ার সময় পাঁজরের নিচের অংশ ভেতরে ঢুকে যায়, নাকের ফুলা বড় হয়ে বাতাস টানতে দেখা যায়, বাচ্চা কথা বলতে বা কাঁদতে গিয়ে হাঁফিয়ে পরে, অথবা ঠোঁট ও আঙুলের নখ নীলচে হয়ে যায়। এই লক্ষণগুলোর যেকোনো একটি দেখা দিলে রাত যাই হোক দেরি না করে হাসপাতালে যেতে হবে।

ডাক্তারের দেওয়া ইনহেলার ঘরে ব্যবহার করা যাবে? বেশি ব্যবহার করলে সমস্যা হবে কি?

ডাক্তার যদি ইনহেলারের নির্দিষ্ট ডোজ ও নিয়ম লিখে দেন, তাহলে সেই অনুযায়ীই ব্যবহার করা যাবে। শ্বাসকষ্ট বাড়লে বা ইনহেলার ব্যবহারের পর ১০-১৫ মিনিটেও উন্নতি না হলে নিজে থেকে ডোজ বাড়ানো ঠিক নয়। ইনহেলার সবসময় স্পেসারসহ (মাস্ক বা স্পেসার যন্ত্র) ব্যবহার করলে ওষুধ ভালোভাবে ফুসফুসে পৌঁছায়। তবে ইনহেলার ব্যবহার করেও যদি বাচ্চার শ্বাসকষ্ট কমতে না চায়, সেটি জরুরি অবস্থার ইঙ্গিত — দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

তথ্যসূত্র

উপরের তথ্যসূত্রগুলো আন্তর্জাতিক জার্নাল, সরকারি স্বাস্থ্য সংস্থা বা স্বীকৃত চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া: