শিশুর ডায়রিয়া হলে কী করবেন?

Rate this post

বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি পরিবারেই কোনো না কোনো সময় শিশুর ডায়রিয়ার সম্মুখীন হয়। এটি সাধারণত ভাইরাসজনিত (বিশেষ করে রোটাভাইরাস) এবং সঠিক পরিচর্যায় সহজেই সামলানো যায়। কিন্তু ভুল ব্যবস্থাপনা—যেমন লবণ-চিনির অনুপাত না মেনে স্যালাইন তৈরি করা বা বুকের দুধ বন্ধ করে দেওয়া—বিপদ ডেকে আনতে পারে। এই গাইডে আমরা ধাপে ধাপে জানাবো কী করবেন আর কী করবেন না, যাতে আপনার শিশু দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠে।

ডায়রিয়ার সাধারণ কারণ কী কী?

শিশুদের ডায়রিয়ার বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দায়ী ভাইরাস, বিশেষ করে রোটাভাইরাস। এছাড়া ব্যাকটেরিয়া (যেমন ই. কোলাই, শিগেলা) ও পরজীবীও ডায়রিয়া ঘটাতে পারে। দূষিত পানি ও খাবারই প্রধান মাধ্যম। তাই অ্যান্টিবায়োটিক সব সময় লাগে না—বেশিরভাগ ভাইরাল ডায়রিয়ায় অ্যান্টিবায়োটিক অকার্যকর। প্রতিরোধে রোটাভাইরাস টিকা অত্যন্ত কার্যকর; বাংলাদেশের জাতীয় টিকাদান কর্মসূচিতে এটি অন্তর্ভুক্ত। টিকা নেওয়ার পরও ডায়রিয়া হতে পারে, তবে তা সাধারণত কম তীব্র হয়।

ঘরেই কী করবেন? (ধাপে ধাপে গাইড)

ডায়রিয়া শুরু হওয়ার পর প্রথম কাজ হলো শিশুকে পর্যাপ্ত তরল দেওয়া। সবচেয়ে কার্যকর হলো ORS (মুখে খাওয়ার স্যালাইন)। সঠিক পদ্ধতি: ১ লিটার পরিষ্কার পানিতে ৬ চা-চামচ চিনি ও ½ চা-চামচ লবণ ভালোভাবে মিশিয়ে নিন। এই মিশ্রণটি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ব্যবহার করুন। বাজারের প্যাকেটজাত ORS-ও ব্যবহার করতে পারেন, তবে নির্দেশনা অনুযায়ী তৈরি করুন।

জিংক সাপ্লিমেন্ট (ট্যাবলেট বা সিরাপ) ১০-১৪ দিন খাওয়ান—এটি ডায়রিয়ার তীব্রতা ও সময় কমায়। তবে ডোজ শিশুর বয়স ও ওজন অনুযায়ী ডাক্তার বা স্বাস্থ্যকর্মীর পরামর্শ নিন।

গুরুত্বপূর্ণ: বুকের দুধ কখনো বন্ধ করবেন না। বুকের দুধই শিশুর জন্য সবচেয়ে নিরাপদ ও পুষ্টিকর তরল। বোতলের দুধ বা গরুর দুধ এড়িয়ে চলুন, কারণ তা ডায়রিয়া বাড়াতে পারে।

ঘরোয়া স্যালাইন (লবণ-চিনির দ্রবণ) তৈরি করলে অনুপাত মেনে চলা জরুরি। বেশি লবণ দিলে শিশুর ক্ষতি হতে পারে, কম লবণ দিলে কাজ হবে না। তাই ORS প্যাকেট ব্যবহার করাই নিরাপদ।

পানিশূন্যতার লক্ষণ: কখন সাবধান হবেন?

ডায়রিয়ার সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো পানিশূন্যতা (ডিহাইড্রেশন)। নিচের টেবিলটি দেখে বুঝতে পারবেন কখন বাড়িতেই চিকিৎসা চালানো নিরাপদ আর কখন জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে।

লক্ষণ মৃদু (বাড়িতেই সামলানো যায়) মাঝারি/গুরুতর (হাসপাতাল প্রয়োজন)
মুখ ও জিহ্বা সামান্য শুষ্ক খুব শুষ্ক, ফেটে যাওয়া
কান্না কান্নায় পানি আছে কান্নায় পানি নেই
চোখ স্বাভাবিক ঢলে যাওয়া (ডোবা চোখ)
প্রস্রাব স্বাভাবিক বা সামান্য কম ৬ ঘণ্টায় প্রস্রাব হয়নি
চামড়া টেনে ছেড়ে দিলে দ্রুত আগের অবস্থায় ফিরে ধীরে ফিরে বা একই থাকে
শিশুর অবস্থা স্বাভাবিক, খেলাধুলা করে অলস, ঝিমুনি, অস্থিরতা

মৃদু পানিশূন্যতায় বাড়িতেই ORS ও তরল দিয়ে চিকিৎসা চালিয়ে যান। কিন্তু মাঝারি বা গুরুতর লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে হাসপাতালে নিয়ে যান।

শিশুকে কী খাওয়াবেন আর কী বাদ দেবেন?

ডায়রিয়ার সময় শিশুকে খাবার দেওয়া বন্ধ করবেন না। বরং সহজপাচ্য ও পুষ্টিকর খাবার দিন।

খাওয়াবেন:

  • বুকের দুধ (যতবার ইচ্ছা ততবার)
  • ডাল-ভাত (মাড়সহ রান্না করা)
  • মাষকালাইয়ের পানি (ডালের পানি)
  • পাকা কলা (ম্যাশ করে)
  • সিদ্ধ আলু, গাজরের স্যুপ

বাদ দেবেন:

  • তৈলাক্ত ও মসলাদার খাবার
  • অতিরিক্ত মিষ্টি দুধ, প্যাকেট জুস, ঠান্ডা পানীয়
  • শক্ত খাবার (যেমন বিস্কুট, চিপস) যদি শিশুর বমি হয়

অনেকের ধারণা ডায়রিয়ায় দুধ বন্ধ করতে হবে—এটি ভুল। বুকের দুধ চালিয়ে যাওয়া জরুরি। তবে গরুর দুধ বা ফর্মুলা দুধ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা ভালো, কারণ ল্যাকটোজ ডায়রিয়া বাড়াতে পারে।

কখন দ্রুত ডাক্তার দেখাবেন বা হাসপাতালে যাবেন?

নিচের যেকোনো একটি লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন বা হাসপাতালে যান:

  • মলের সাথে রক্ত বা পুঁজ
  • প্রচণ্ড বমি (যাতে কিছুই মুখে রাখতে পারছে না)
  • শিশু অলস হয়ে যাচ্ছে বা ঝিমুনি আসছে
  • ৬ ঘণ্টার বেশি প্রস্রাব হয়নি
  • চোখ ঢলে গেছে, মুখ শুকিয়ে গেছে
  • প্রচণ্ড জ্বর (১০১° ফারেনহাইটের বেশি)
  • ডায়রিয়া ৭ দিনের বেশি স্থায়ী

এক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ডায়রিয়া প্রতিরোধক ওষুধ (যেমন লোপেরামাইড) বা অ্যান্টিবায়োটিক দেবেন না। এসব ওষুধ শিশুর জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। প্রয়োজনে কুমিল্লায় মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার খুঁজুন বা শিশুর শ্বাসকষ্ট থাকলে কুমিল্লায় ভেরিফাইড বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ ডাক্তার-এর পরামর্শ নিন। এছাড়া কান বা গলার সমস্যা থাকলে কুমিল্লায় টপ নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞ ডাক্তার-এর কাছে যেতে পারেন।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

শিশুকে ঘরে তৈরি স্যালাইন দেওয়ার সময় লবণ-চিনির সঠিক অনুপাত কীভাবে মাপব?

ঘরে তৈরি স্যালাইনে লবণ-চিনির অনুপাত খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ঠিক নিয়ম হলো: এক লিটার বিশুদ্ধ পানিতে (অর্থাৎ ৫ কাপ পানি) ৬ চা-চামচ চিনি আর আধা চা-চামচ লবণ মেশাবেন। মনে রাখবেন, চিনি বেশি দিলে স্যালাইন আরও খারাপ করতে পারে (অর্থাৎ ডায়রিয়া বাড়তে পারে), আর লবণ বেশি দিলে শিশুর কিডনির ক্ষতি হতে পারে। তাই ‘চোখে আন্দাজ’-এ কখনোই স্যালাইন তৈরি করবেন না। ফুটিয়ে ঠান্ডা করা বা ফিল্টার করা নিরাপদ পানি ব্যবহার করুন। যদি খালি চোখে নাপছন্দ হয়, তাহলে ফার্মেসি থেকে রেডিমেড প্যাকেটজাত স্যালাইন কিনে নির্দেশনামতো গুলিয়ে দেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।

ডায়রিয়ার সময় শিশুকে বুকের দুধ বন্ধ রাখা কি ঠিক?

একেবারেই না। বুকের দুধ ডায়রিয়ার সময় সবচেয়ে ভালো ওষুধের মতো কাজ করে। এতে থাকা অ্যান্টিবডি (ইমিউনোগ্লোবুলিন) শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী করে এবং দ্রুত সুস্থ হতে সাহায্য করে। এমনকি ডায়রিয়া চলাকালীনও মাকে স্বাভাবিকভাবে বুকের দুধ খাওয়াতে হবে। শুধু খেয়াল রাখবেন, শিশু যত বেশি দুধ পায়, তত বেশি তরল পায়—যা পানিশূন্যতা ঠেকাতে সহায়ক। তবে মায়ের নিজের খাবারে স্বাস্থ্যকর ও মসলাবিহীন খাবার ও প্রচুর পানি গ্রহণ জরুরি, যাতে দুধের পুষ্টিগুণ বজায় থাকে।

ডায়রিয়ার সময় শিশুকে পানি বা ফলের রস দেওয়া কি নিরাপদ?

ডায়রিয়ায় শিশুর শরীর থেকে পানি ও ইলেক্ট্রোলাইট (লবণ-পটাশিয়াম) দুটোই বেরিয়ে যায়। শুধু পানি দিলে ইলেক্ট্রোলাইট মিটবে না, আর ফলের রসে (বিশেষ করে আম, লিচু বা আখের রস) চিনি বেশি থাকায় ডায়রিয়া আরও বাড়তে পারে। তাই নিরাপদ উপায় হলো: ঘরে তৈরি স্যালাইন বা ফার্মেসির প্যাকেটজাত স্যালাইন। ৬ মাসের কম বয়সী শিশুর জন্য শুধু বুকের দুধ বা ফর্মুলা মিল্ক, আর বড় শিশুর জন্য স্যালাইনই সেরা। ফলের রস দেওয়ার ইচ্ছা হলে একেবারে সীমিত পরিমাণে (যেমন এক টেবিল চামচ) এবং পাতলা করে দিন (যেমন রসের সঙ্গে ৪ ভাগ পানি মিশিয়ে)। তবে সাধারণ নিয়ম হলো, ফল খাওয়াতে চাইলে ব্লেন্ডার না করে শুধু পাকা কলা বা সিদ্ধ আলু পিষে দিন—এগুলো পাকে শক্ত করে।

তথ্যসূত্র

উপরের তথ্যসূত্রগুলো আন্তর্জাতিক জার্নাল, সরকারি স্বাস্থ্য সংস্থা বা স্বীকৃত চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া: