নবজাতকের জন্ডিস কখন বিপজ্জনক?

Rate this post

নবজাতকের জন্ডিস নিয়ে প্রায় প্রতিটি পরিবারই কোনো না কোনো সময়ে দুশ্চিন্তায় পড়েন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এটি স্বাভাবিক (ফিজিওলজিক্যাল জন্ডিস) এবং নিজে থেকেই সেরে যায়। কিন্তু কিছু নবজাতকের ক্ষেত্রে জন্ডিস বিপজ্জনক রূপ নিতে পারে, যা দ্রুত চিকিৎসা না করালে মস্তিষ্কের স্থায়ী ক্ষতি (কর্ণিক্টেরাস) পর্যন্ত ডেকে আনতে পারে। তাই অভিভাবক হিসেবে জানা জরুরি: কখন এই জন্ডিসকে স্বাভাবিক আর কখন জরুরি অবস্থা হিসেবে দেখা উচিত। নিচের আলোচনায় সেই পার্থক্যগুলো বিস্তারিতভাবে বুঝিয়ে বলা হলো।

শিশুর জন্ডিস কেন হয়? কখন এটি স্বাভাবিক?

জন্মের পর নবজাতকের লিভার এখনও পুরোপুরি পরিণত হয় না। ফলে রক্তে বিলিরুবিন নামক হলুদ রঞ্জক পদার্থের মাত্রা বেড়ে গিয়ে চামড়া ও চোখের সাদা অংশ হলুদ দেখায়—এটিই জন্ডিস। সাধারণত জন্মের ২৪ ঘণ্টা পার হওয়ার পর থেকে দ্বিতীয় বা তৃতীয় দিনে জন্ডিস প্রকাশ পায় এবং দশম দিনের মধ্যে নিজে নিজেই কমে যায়। এটি স্বাভাবিক (ফিজিওলজিক্যাল) জন্ডিস। এ ক্ষেত্রে শিশু সক্রিয় থাকে, ভালোভাবে বুকের দুধ বা ফর্মুলা খায়, এবং প্রস্রাব-মল স্বাভাবিক থাকে। কোনো চিকিৎসার প্রয়োজন হয় না; কেবল নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও সঠিক খাওয়ানোই যথেষ্ট।

কোন কোন লক্ষণ দেখলে সাবধান হবেন?

কিছু নির্দিষ্ট লক্ষণ রয়েছে যা স্বাভাবিক জন্ডিসের চেয়ে ভিন্ন এবং বিপজ্জনক হতে পারে। নিচের লক্ষণগুলোর যেকোনো একটি দেখা দিলে দ্রুত একজন শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি:

  • প্রথম ২৪ ঘণ্টায় জন্ডিস দেখা দেওয়া: জন্মের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে চামড়া বা চোখ হলুদ হয়ে গেলে এটি স্বাভাবিক নয়।
  • জন্ডিস দ্রুত ছড়ানো: শুধু মুখ বা বুকের ওপর সীমাবদ্ধ না থেকে হাত, পা, এমনকি পেট পর্যন্ত হলুদ হয়ে যাওয়া।
  • অলসতা ও খেতে না চাওয়া: শিশু খুব ঘুমিয়ে থাকে, জেগে উঠতে চায় না, বা বুকের দুধ/ফর্মুলা খেতে আগ্রহ দেখায় না।
  • কান্নার স্বর পরিবর্তন: অস্বাভাবিক, উচ্চ-পিচের কান্না যা সাধারণ কান্নার মতো নয়।
  • মল ফ্যাকাশে সাদা হওয়া: নবজাতকের মল সাধারণত হলুদ-সবুজ হয়। যদি সাদা বা মাটির রঙের হয়, তাহলে এটি পিত্তনালীর সমস্যা নির্দেশ করতে পারে।
  • শরীরের তাপমাত্রা অস্বাভাবিক: জ্বর বা শরীর ঠান্ডা হয়ে যাওয়া—উভয়ই সংক্রমণের লক্ষণ হতে পারে।

এই লক্ষণগুলো দেখা দিলে আর অপেক্ষা না করে সরাসরি হাসপাতাল বা ডাক্তারের কাছে যান।

স্বাভাবিক ও বিপজ্জনক জন্ডিসের তুলনা

স্বাভাবিক ও বিপজ্জনক জন্ডিসের প্রধান পার্থক্য
বৈশিষ্ট্য স্বাভাবিক (ফিজিওলজিক্যাল) বিপজ্জনক (প্যাথোলজিক্যাল)
প্রকাশের সময় জন্মের ২৪ ঘণ্টা পর (২য়–৩য় দিন) জন্মের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে
ছড়ানোর মাত্রা শুধু মুখ ও বুক পর্যন্ত সীমিত হাতের তালু, পায়ের পাতা, পেট—সব জায়গায়
শিশুর অবস্থা সক্রিয়, ভালো খাচ্ছে, স্বাভাবিক কান্না অলস, খেতে চায় না, অস্বাভাবিক কান্না
মল ও প্রস্রাব মল হলুদ-সবুজ, প্রস্রাব স্বাভাবিক মল ফ্যাকাশে সাদা, প্রস্রাব ঘন হলুদ
চিকিৎসার প্রয়োজন সাধারণত নেই; পর্যবেক্ষণই যথেষ্ট রক্ত পরীক্ষা করে ফটোথেরাপি বা অন্য চিকিৎসা প্রয়োজন

তবে, শুধু উপরের টেবিল দেখেই নিজে সিদ্ধান্ত নেবেন না। কোনো সন্দেহ থাকলে সবচেয়ে নিরাপদ পথ হলো কুমিল্লায় একজন মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দেখানো—বিশেষ করে যদি নবজাতকের ওজন কম হয়, সময়ের আগে জন্ম হয়, বা রক্তের গ্রুপে মা-বাবার অমিল থাকে।

কখন সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তার দেখাবেন?

নিচের যেকোনো একটি পরিস্থিতিতে দেরি না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন:

  • জন্মের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই জন্ডিস দেখা দিলে।
  • হাত-পা বা পেটের চামড়া স্পষ্ট হলুদ হয়ে গেলে।
  • শিশু খুব অলস, খেতে চায় না, বা অস্বাভাবিক কান্না করছে।
  • মল ফ্যাকাশে সাদা বা মাটির রঙের হলে এবং প্রস্রাব গাঢ় হলুদ হলে।
  • পূর্বের তুলনায় জন্ডিস কমার পরিবর্তে আরও বাড়ছে বলে মনে হলে।

বাংলাদেশের অধিকাংশ সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালেই নবজাতকের জন্ডিস স্ক্রিনিং ও চিকিৎসার ব্যবস্থা আছে। মনে রাখবেন, প্রাথমিক অবস্থায় ধরা পড়লে চিকিৎসা অনেক সহজ ও কার্যকর।

ডাক্তার কী করবেন? চিকিৎসার আধুনিক পদ্ধতি

ডাক্তার প্রথমে রক্ত পরীক্ষা করে বিলিরুবিনের মাত্রা ও অন্যান্য কারণ (যেমন রক্তের গ্রুপ অসামঞ্জস্যতা, সংক্রমণ) নির্ণয় করবেন। এই পরীক্ষার ফল, শিশুর গর্ভকালীন বয়স, ওজন ও সাধারণ স্বাস্থ্যের ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসা নির্ধারণ করা হয়। প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতিগুলো হলো:

  • ফটোথেরাপি (আলো থেরাপি): এটি সবচেয়ে সাধারণ ও কার্যকর চিকিৎসা। শিশুকে বিশেষ নীল আলোর নিচে রেখে ত্বকের মাধ্যমে বিলিরুবিন ভাঙানো হয়। সাধারণত ২-৩ দিনের মধ্যে জন্ডিস কমে যায়।
  • এক্সচেঞ্জ ট্রান্সফিউশন: কেবলমাত্র খুব উচ্চ মাত্রার বিলিরুবিন বা ফটোথেরাপিতে ফল না এলে এই পদ্ধতি নেওয়া হয়। এতে শিশুর অল্প পরিমাণ রক্ত বের করে তাজা রক্ত প্রবেশ করানো হয়। এটি সম্পূর্ণ হাসপাতালের তত্ত্বাবধানে বিশেষজ্ঞদের দ্বারা করা হয়।
  • অন্তর্নিহিত কারণের চিকিৎসা: জন্ডিস যদি সংক্রমণ, থাইরয়েড সমস্যা বা লিভারের রোগের কারণে হয়ে থাকে, তাহলে সেই কারণেরও চিকিৎসা দেওয়া হয়।

গুরুত্বপূর্ণ কথা: ঘরোয়া পদ্ধতি যেমন রোদে রাখা বা মধু খাওয়ানো—এগুলো অকার্যকর, অপ্রয়োজনীয় এবং কখনো কখনো ক্ষতিকরও হতে পারে (যেমন মধুতে ব্যাকটেরিয়া থাকতে পারে)। কোনো অবস্থাতেই নিজ থেকে ওষুধ, সিরাপ বা গ্রিন টি খাওয়াবেন না। প্রসঙ্গত, নবজাতক জন্ডিসের কারণে অনেক সময় মায়ের মানসিক চাপ বাড়ে; প্রয়োজনে কুমিল্লায় টপ মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার-এর পরামর্শ নেওয়াও সহায়ক হতে পারে।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

বাচ্চার জন্ডিস বাড়ছে কিনা বাড়িতে বসে কীভাবে বুঝব?

প্রতিদিন পর্যাপ্ত আলোতে (প্রাকৃতিক আলোয়) বাচ্চার ত্বক, চোখের সাদা অংশ ও পায়ের তালু দেখুন। জন্ডিস যদি ধীরে ধীরে মুখ থেকে বুক, পেট, এমনকি পায়ের তালু পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে, তবে তা বিপজ্জনক মাত্রায় বাড়তে পারে। এছাড়া বাচ্চা যদি খুব অলস থাকে, ঠিকমতো দুধ খেতে না পারে, বা চিৎকারের সুর অস্বাভাবিক উঁচু হয়, তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। নিজে থেকে বিলিরুবিন মাপার চেষ্টা করবেন না—শুধু লক্ষণ দেখে সতর্ক হোন।

অপরিণত (প্রিম্যাচিউর) নবজাতকের জন্ডিস কি বেশি বিপজ্জনক?

হ্যাঁ, অপরিণত শিশুদের লিভার অপেক্ষাকৃত অপরিণত থাকে, ফলে বিলিরুবিন প্রক্রিয়াজাত করতে বেশি সময় লাগে এবং মাত্রা দ্রুত বাড়তে পারে। এছাড়া তাদের রক্ত-মস্তিষ্কের বাধা (ব্লাড-ব্রেন ব্যারিয়ার) দুর্বল থাকায় কর্ণিক্টেরাসের ঝুঁকি বেশি। তাই প্রিম্যাচিউর শিশুর জন্ডিসকে আরও সতর্কতার সাথে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন এবং চিকিৎসকের নির্দেশ অনুযায়ী বিলিরুবিন পরীক্ষা করানো জরুরি।

বাচ্চাকে রোদে বসিয়ে জন্ডিস সারানো যায়?

সূর্যের আলোতে অতিবেগুনি রশ্মি থাকে যা ত্বকের মাধ্যমে বিলিরুবিন ভাঙতে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু এটি নিয়ন্ত্রিত পদ্ধতি নয়। অতিরিক্ত রোদে শিশুর ত্বক পুড়ে যেতে পারে বা পানিশূন্যতা দেখা দিতে পারে। ফটোথেরাপি (নীল বাতি) চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে প্রয়োগ করা হয়, যা অনেক বেশি কার্যকর ও নিরাপদ। তাই বাচ্চাকে সরাসরি রোদে বসানোর পরিবর্তে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা করানোই উত্তম।

তথ্যসূত্র

উপরের তথ্যসূত্রগুলো আন্তর্জাতিক জার্নাল, সরকারি স্বাস্থ্য সংস্থা বা স্বীকৃত চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া: